খাল খনন হবে—নাকি খালের পাড় দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাগুলোই থেকে যাবে? বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নে এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মুখে মুখে। খালের দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে খননকাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও তা না করে স্থাপনা মালিকদের সঙ্গে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের কথিত দেনদরবার ও দরকষাকষির অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, গত দুই দিন ধরে খালের দুই পাড়ে থাকা প্রায় অর্ধশতাধিক পাকা-কাঁচা অবৈধ স্থাপনার মালিকদের সঙ্গে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বৈঠক করছেন। অভিযোগ রয়েছে, খননকাজের আওতা থেকে এসব স্থাপনা বাদ দেওয়া কিংবা উচ্ছেদ ঠেকানোর বিষয়ে তাদের মধ্যে দরকষাকষি চলছে। এমনকি কয়েকজন স্থাপনা মালিকের কাছ থেকে গোপনে মোটা অঙ্কের টাকা উত্তোলনের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
যেখানে খনন শেষ হওয়ার কথা, সেখানেই ৪০০ ফুট অসমাপ্ত
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাবুগঞ্জ উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের লাষঘাটা সন্ধ্যা নদীর সংযোগ খালটি আগরপুর বন্দরের পাশ দিয়ে গৌরনদীর সরিকল ইউনিয়নের সাকোকাঠি হয়ে বাটাজোর পর্যন্ত বিস্তৃত। দীর্ঘদিনের পলি ও দখলে সংকুচিত হয়ে পড়া খালটির খননকাজ বর্তমানে প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু আগরপুর বাজারসংলগ্ন সাকোকাঠি সুইজগেট এলাকার প্রায় ৪০০ ফুট অংশে এসে থমকে আছে খননকাজ।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—খালের অধিকাংশ অংশের খননকাজ প্রায় শেষ হলেও এই নির্দিষ্ট অংশেই কেন জটিলতা? কেনই বা খাল খননের আগে অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের পরিবর্তে এখন স্থাপনা মালিকদের সঙ্গে দেনদরবারের অভিযোগ উঠছে?
খনন শুরু হতেই সামনে আসে স্থাপনার বিষয়
গত ৭ আগস্ট শনিবার অসমাপ্ত ওই প্রায় ৪০০ ফুট অংশে খননকাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু খালের দুই পাড়ে গড়ে ওঠা প্রায় অর্ধশতাধিক পাকা ও কাঁচা অবৈধ স্থাপনা নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের জায়গা দখল করে বছরের পর বছর এসব স্থাপনা গড়ে উঠলেও এতদিন কার্যকর কোনো উচ্ছেদ অভিযান হয়নি। এখন খননকাজ শুরু হওয়ার সময় স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের প্রশ্ন সামনে আসতেই একটি মহল সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, স্থাপনা উচ্ছেদ না করে কীভাবে খননকাজ চালানো যায়, অথবা স্থাপনা মালিকদের কীভাবে ‘ম্যানেজ’ করা যায়—এ নিয়েই চলছে কথিত দেনদরবার।
‘গোপনে টাকা তোলার’ অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যসহ একাধিক সূত্র দাবি করেছেন, খালের দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা মালিকদের কাছ থেকে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল গোপনে মোটা অঙ্কের টাকা উত্তোলন করেছে।
তাদের অভিযোগ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ঠেকানো কিংবা স্থাপনাগুলো টিকিয়ে রাখার আশ্বাস দিয়েই এসব অর্থ নেওয়া হয়েছে। এদিকে অভিযোগের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
প্রশাসনের বক্তব্য: অবৈধ স্থাপনা রেখে খননের সুযোগ নেই
অবৈধ স্থাপনা রেখে খাল খননের কোনো সুযোগ আছে কি না—
এ প্রশ্নের জবাবে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম বলেন,এমন কোনো সুযোগ নেই। খালের দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেই যথাযথ নিয়মে খাল খননের কাজ করতে হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এই বক্তব্যের পর স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—যদি অবৈধ স্থাপনা রেখে খননের সুযোগই না থাকে, তাহলে খননকাজ শুরুর আগে স্থাপনা উচ্ছেদে প্রশাসনিক পদক্ষেপ কোথায়? আর কারা বা কেন স্থাপনা মালিকদের সঙ্গে দেনদরবার করছেন?
খাল রক্ষা নাকি দখলদারদের স্বার্থ রক্ষা?
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, খাল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। একটি খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু নৌযাতায়াত নয়, পানি নিষ্কাশন, কৃষি ও পরিবেশ—সবকিছুর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দখল ও অবৈধ স্থাপনার কারণে খালটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সরকারি অর্থে খাল খননের উদ্যোগ নেওয়ার পরও যদি দখলদারদের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়, তাহলে খননের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।
সচেতন মহল বলছে, প্রভাবশালী কোনো মহলের কথিত দেনদরবার বা অর্থ লেনদেনের অভিযোগের কারণে যেন খাল খনন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত না হয়। খালের সীমানা নির্ধারণ করে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, অভিযোগের তদন্ত এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে খননকাজ সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এখন বড় প্রশ্ন—কার স্বার্থে আটকে আছে খালের ৪০০ ফুট?
একদিকে সরকারি উদ্যোগে খাল খনন, অন্যদিকে খালের জায়গা দখল করে থাকা অর্ধশতাধিক অবৈধ স্থাপনা। এর মধ্যেই ওঠেছে দেনদরবার ও গোপনে টাকা উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ।
প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেই খাল খনন করতে হবে। তাহলে বাস্তবে সেই উচ্ছেদ কার্যক্রম কবে শুরু হবে? কারা স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের পথে বাধা দিচ্ছে? অভিযোগ অনুযায়ী অর্থ লেনদেন হয়ে থাকলে তার সঙ্গে কারা জড়িত? এবং শেষ পর্যন্ত খালের জায়গা কি খালই থাকবে, নাকি প্রভাবশালীদের তৎপরতায় অবৈধ স্থাপনাগুলোই থেকে যাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছেন সরিকল ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করবে এবং খালের দুই পাড় দখলমুক্ত করে অসমাপ্ত খননকাজ দ্রুত শেষ করবে।





































