একসময় খুলনা ছিল দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পনগরী। পাটকল, জুট প্রেস, দৌলতপুরের পাটের মোকাম, নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল ও টেক্সটাইল মিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল এসব শিল্পে। শিল্পের সঙ্গে বেড়েছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, আবাসন ও নগর অর্থনীতি। সেই খুলনা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, কমেছে কর্মসংস্থান, দুর্বল হয়েছে স্থানীয় অর্থনীতির গতি। কিন্তু খুলনার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। বরং মোংলা বন্দরের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা, নদীপথের সুবিধা এবং সড়ক-রেল যোগাযোগ খুলনাকে নতুন করে শিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে একটি পুরোনো অবকাঠামো নতুন ভূমিকা নিতে পারে—খুলনা মহানগরীর ৭ নম্বর ঘাট এলাকার রুজভেল্ট জেটি।
সম্প্রতি মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আয়োজিত অংশীজন সম্মেলনে মোংলা কাস্টমস এজেন্টস এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ মোশারফ হোসেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলামের কাছে রুজভেল্ট জেটিকে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো বা আইসিডিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবটি গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ, এর সঙ্গে শুধু একটি জেটির উন্নয়ন নয়, খুলনার শিল্প পুনরুজ্জীবন ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে নগরীর সরাসরি বাণিজ্যিক সংযোগ তৈরির প্রশ্ন জড়িত।
কারখানা খুললেই শিল্প ফিরবে না
বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। পাটকলসহ পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনে ফিরলে কর্মসংস্থান বাড়বে, স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। কিন্তু কারখানা চালু করলেই শিল্পের পূর্ণাঙ্গ পুনরুজ্জীবন হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
শিল্পের জন্য কাঁচামাল যেমন প্রয়োজন, তেমনি উৎপাদিত পণ্য দ্রুত ও কম খরচে বাজারে পৌঁছানোও জরুরি। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে বন্দর পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত।
খুলনার শিল্পপণ্য যদি উৎপাদনকেন্দ্র থেকে মোংলা বন্দরে নিতে অতিরিক্ত সময় ও খরচ হয়, তাহলে শিল্পোদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প পথ খুঁজবেন। ফলে শিল্প পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনার সঙ্গে লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়নকে একই গুরুত্ব দিতে হবে।
এখানেই রুজভেল্ট জেটির প্রাসঙ্গিকতা।
আইসিডি হলে কী বদলাতে পারে?
রুজভেল্ট জেটিকে আধুনিক আইসিডিতে রূপান্তর করা গেলে খুলনার শিল্পাঞ্চল ও মোংলা বন্দরের মধ্যে একটি কার্যকর লজিস্টিক সেতু তৈরি হতে পারে। খুলনা ও আশপাশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য সড়ক বা রেলপথে রুজভেল্ট জেটিতে আনা যাবে। সেখানে কনটেইনারে পণ্য বোঝাই, সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় হ্যান্ডলিং শেষে বার্জ বা ছোট কার্গো ভেসেলে নদীপথে পাঠানো যেতে পারে মোংলা বন্দরে। একইভাবে মোংলা বন্দরে আমদানি করা পণ্যের একটি অংশ নদীপথে এনে খুলনায় খালাস, সংরক্ষণ ও বিতরণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হতে পারে।
এতে খুলনা-মোংলা বাণিজ্যিক সম্পর্ক কেবল ভৌগোলিক নৈকট্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা একটি সমন্বিত লজিস্টিক ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে।
আর এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা—সড়ক, রেল ও নৌপথকে একই সরবরাহব্যবস্থার আওতায় আনা।
নদীপথের ব্যবহার বাড়ানো দরকার
বাংলাদেশে পণ্য পরিবহনে সড়কের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। এর ফলে সড়কে চাপ বাড়ছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং পণ্য পরিবহনে সময়ও বেশি লাগছে। বড় পরিমাণ পণ্য পরিবহনে নৌপথের ব্যবহার বাড়ানো গেলে এই চাপ কমানো সম্ভব।
খুলনা-মোংলা নদীপথের ভৌগোলিক সুবিধা এখানে বড় সম্পদ। রুজভেল্ট জেটিকে আধুনিক লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে নদীপথকে বাণিজ্যিকভাবে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে। মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি করা সারসহ বিভিন্ন বাল্ক পণ্য বার্জে করে রুজভেল্ট জেটিতে এনে খালাস করা যেতে পারে। পরে সেগুলো খুলনা ও আশপাশের জেলাগুলোতে বিতরণ করা সম্ভব। এতে একদিকে সড়ক পরিবহনের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে পণ্য সরবরাহের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
শুধু আইসিডি নয়, হতে পারে লজিস্টিক হাব
রুজভেল্ট জেটির সম্ভাবনাকে শুধু কনটেইনার ডিপোতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এটিকে বহুমুখী লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। কনটেইনার ইয়ার্ড, গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ, প্যাকেজিং, কার্গো হ্যান্ডলিং, ট্রাক ও বার্জ সেবা, মেরিন সার্ভিসসহ নানা ধরনের সহায়ক কার্যক্রম এখানে গড়ে উঠতে পারে। এসব সেবাকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবসা সৃষ্টি হবে। তৈরি হবে সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান।
এ ধরনের অবকাঠামো খুলনার অর্থনীতিতে বহুগুণ প্রভাব ফেলতে পারে। একটি কনটেইনার এখানে এলে শুধু সেটি ওঠানো-নামানোর জন্য শ্রমিক প্রয়োজন হয় না; পরিবহন, গুদাম, প্যাকেজিং, কাগজপত্র, কাস্টমস, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ—বহু খাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়।
মোংলা বন্দরেরও প্রয়োজন সহায়ক অবকাঠামো
মোংলা বন্দরের কার্যক্রম যত বাড়বে, ভবিষ্যতে তত বেশি সহায়ক অবকাঠামোর প্রয়োজন হবে। নতুন শিল্প, ইপিজেড সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে কনটেইনার ও কার্গো ব্যবস্থাপনার চাপও বাড়বে। রুজভেল্ট জেটি সে ক্ষেত্রে মোংলা বন্দরের বিকল্প নয়; বরং সহায়ক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে। মোংলা বন্দরের সঙ্গে সমন্বয় করে কিছু পণ্য ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনা খুলনায় করা গেলে মূল বন্দরের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে খুলনাকে মোংলা বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ পশ্চাৎভূমি বা হিন্টারল্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
দরকার সমীক্ষা, আবেগ নয়
তবে রুজভেল্ট জেটিকে আইসিডিতে রূপান্তরের প্রস্তাব বাস্তবায়নে আবেগ দিয়ে এগোনোর সুযোগ নেই। আগে প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা।
জেটির নাব্যতা, নদীর গতিপ্রকৃতি, জাহাজ ও বার্জ চলাচলের সক্ষমতা, জমি, সড়ক ও রেল সংযোগ, পরিবেশগত প্রভাব, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা এবং মোংলা বন্দরের সঙ্গে অপারেশনাল সমন্বয়—সবকিছু যাচাই করতে হবে।
প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ও আয়, বিনিয়োগের ধরন এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগও স্পষ্ট করতে হবে। প্রয়োজন হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা PPP মডেলে বিনিয়োগ আনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
খুলনার সামনে সুযোগটি হাতছাড়া করা উচিত নয়
খুলনার শিল্প পুনরুজ্জীবনের জন্য এখন বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন সমন্বিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। বন্ধ কারখানা চালু করার পাশাপাশি নতুন শিল্পে বিনিয়োগ আনতে হবে, মোংলা বন্দরের সুবিধা কাজে লাগাতে হবে এবং পরিবহনব্যবস্থাকে সাশ্রয়ী ও দক্ষ করতে হবে।
এই বৃহত্তর পরিকল্পনায় রুজভেল্ট জেটি একটি কৌশলগত অবকাঠামো হতে পারে।
একসময় নদী ও শিল্পকে কেন্দ্র করে খুলনার অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল। আজ সেই নদী ও বন্দরের সম্ভাবনাকে আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেই খুলনার অর্থনীতিকে নতুন পথে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
রুজভেল্ট জেটিকে আধুনিক আইসিডি ও বহুমুখী লজিস্টিক হাবে রূপ দেওয়া গেলে শিল্পপণ্য মোংলা বন্দরে পৌঁছানো সহজ হবে, নদীপথের ব্যবহার বাড়বে, নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, খুলনা সরাসরি মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত হতে পারবে।
তাই রুজভেল্ট জেটির প্রস্তাবকে আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখার সময় শেষ। প্রয়োজন এখন সম্ভাব্যতা যাচাই, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত।
খুলনার হারানো শিল্পনগরীর গতি ফিরিয়ে আনতে হয়তো নতুন করে সবকিছু শুরু করার প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান সম্পদ ও ভৌগোলিক সুবিধাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। রুজভেল্ট জেটি সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা।





































