বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, আমেরিকা-এর উদ্যোগে নিউইয়র্কে সম্প্রতি "Persecution Has No Winners: How Minority Oppression in Bangladesh Harms the Majority and the Nation" শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে গত শনিবার নিউইয়র্কর জ্যামাইকা হিলসাইড এভিনিউতে। সেমিনারে বক্তারা বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চলা দীর্ঘমেয়াদী নিপীড়ন, নির্যাতন এবং এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলি তুলে ধরে বলেন যে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সমস্যা নয়, বরং এটি সমগ্র জাতির নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক অশনিসংকেত।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাইনরিটি গবেষক মৃন্ময় সমদ্দার এবং অ্যাটর্নি অশোক কুমার কর্মকার। যৌথভাবে প্রস্তুতকৃত মূল প্রবন্ধে বলা হয় যে, বাংলাদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের—বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের—ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা নিপীড়নকে কেবল একটি সাম্প্রদায়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে এর গুরুতর জাতীয় প্রভাব থেকে যায়। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা অস্বীকার করা, ঘটনাগুলোকে খাটো করে দেখা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক নাগরিকত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তাকে দুর্বল করে তোলে।
প্রবন্ধটিতে ১৯৭২ সালের সাংবিধানিক অঙ্গীকার থেকে শুরু করে শত্রু ও অর্পিত সম্পত্তি ব্যবস্থা, পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনী, বাবরি মসজিদ ধ্বংস-পরবর্তী হামলা, ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, ২০১৩ সালের নির্যাতন, ২০১৬ সালের নাসিরনগর হামলা, ২০২১ সালের কুমিল্লাকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক রূপান্তর-পরবর্তী ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী ঘটনাগুলোকে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে যে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি সহিংসতাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং আইনগতভাবে সহনীয় করে তোলে। এই সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি একসময় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া, সুফি, বাউল ও ফকীর সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে নারী, সাংবাদিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী এবং সাধারণ নাগরিকদেরও আক্রান্ত করতে পারে, যার স্পষ্ট নমুনা ইতোমধ্যে দেশবাসী দেখেছে। এই পুরো বিষয়টি আন্তর্জাতিক স্তরেও ব্যাপকভাবে প্রকাশিত ও আলোচিত হয়েছে। সেকারণে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল মানবাধিকার রক্ষার একটি খণ্ডিত বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার একটি অত্যন্ত মৌলিক পূর্বশর্ত।
সেমিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক স্বপন কান্তি দাস। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন যে, বর্তমান বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অব্যাহতভাবে নির্যাতন চলছে এবং প্রশাসন বা সরকার তাদের সুরক্ষায় কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
সেমিনারে গেস্ট স্পিকার হিসেবে বক্তব্য রাখেন, লেখিকা তসলিমা নাসরিন, অধ্যাপক রাজেশ সম্পাত, মানবিধার আইনজীবি এডভোকেট মনজিল মোরশেদ, এর্টনী অশোক কুমার কর্মকার প্রমুখ সেমিনারে মতামত তুলে ধরেন।
সেমিনারে বিশেষ বক্তা হিসেবে তসলিম নাসরিন বলেন যে, বাংলাদেশি হিন্দুরা আজ চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে এবং ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিস্টদের ক্রমাগত হামলা ও নিপীড়নের মুখে তারা তাদের প্রাচীন ভিটেমাটি এবং জন্মভূমি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। তারা আজ বিভিন্ন দেশে শরণার্থী বা পরবাসীর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশিষ্ট বক্তারা আরও উল্লেখ করেন যে, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং এর ফলে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেমন বিবিসি বা আল জাজিরার সংবাদ প্রচারের ধরন নিয়েও সেমিনারে আলোচনা করা হয়। এছাড়া উর্বশী সান্যাল সংখ্যালঘুদের ওপর জাতিগত নিধন ও সহিংসতার বিভিন্ন দিক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন।
সেমিনারে উপস্থাপিত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত এবং পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর হার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন ঐতিহাসিক জনমিতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে দেখানো হয় যে, বিগত দশকগুলোতে দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনুপাত উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে, যা দেশত্যাগের প্রবণতাকেই স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।
অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, আমেরিকা-এর সভাপতিদ্বয় নয়ন বড়ুয়া ও গিতা চক্রবর্তী।
সভাপতির বক্তব্যে তারা বলেন যে, দেশের এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সেমিনারের শেষ পর্যায়ে উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণকারীরা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং অবিলম্বে একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।





































