বিশ্বকাপ ফুটবলে সাধারণত ‘তৃতীয় স্থান নির্ধারণী’ ম্যাচ নিয়ে দর্শকদের খুব একটা আগ্রহ থাকে না। শিরোপার লড়াই থেকে ছিটকে যাওয়ার পর এই ম্যাচটি অনেকের কাছেই কেবলই আনুষ্ঠানিকতা, অনেক সময় দলগুলোর ‘মর্যাদার লড়াই’। তবে এবারের দৃশ্যপট ভিন্ন। শুধু ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের ইতিহাস তৈরির সম্ভাবনার জন্যই এবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে চোখ রাখবেন সবাই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই ম্যাচটি এখন কিলিয়ান এমবাপ্পের ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক মহাকাব্যিক অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার সামনে বিশ্বকাপ ফুটবলের রোমাঞ্চকর মঞ্চে নিজের নাম সোনার অক্ষরে খোদাই করে রাখার সুযোগ। এই ম্যাচে তিনি যদি গোল পান, আর ফাইনালে গোলবঞ্চিত থাকেন মেসি, তবে টানা দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বুট জিতবেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এমন রেকর্ড আর কারও নেই।
এই রেকর্ড ছাড়া আরও একটি রেকর্ডের হাতছানি এমবাপ্পের সামনে। এবারের আসরেই বিশ্বকাপ ফুটবলে সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ডটিও দখল করে ফেলতে পারেন তিনি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার ‘গোল্ডেন বুট’ জিতে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। চলতি বিশ্বকাপেও তার সেই চেনা ফর্ম অব্যাহত। এবারের আসরেও তিনি আর্জেন্টাইন জাদুকর লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছেন। মেসি-এমবাপ্পে দ্বৈরথ শেষ সুযোগের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। চলতি টুর্নামেন্টে এমবাপ্পে ও মেসি—দুজনেই আর মাত্র একটি করে ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন। আর নিজেদের এই একটি করে ম্যাচেই নির্ধারণ হবে এবারের আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট। চলতি বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এই দুই মহানায়কের পরিসংখ্যানও বেশ জমজমাট। এবারের আসরে কিলিয়ান এমবাপ্পে এখন পর্যন্ত ৮টি গোল করেছেন। তার সহায়তায় গোল হয়েছে তিনটি। অর্থাৎ ৮ গোলের সঙ্গে অ্যাসিস্ট তিনটি।
অন্যদিকে লিওনেল মেসিও গোল করেছেন ৮টি। তবে তার অ্যাসিস্টের সংখ্যা এমবাপ্পের চেয়ে একটি বেশি। তাই এখন পর্যন্ত গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে কিঞ্চিৎ এগিয়ে আছেন মেসি। নিজেদের শেষ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্টের যেকোনো ব্যবধানই এই দুই তারকার ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে। ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে টানা দুই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জেতার কীর্তি রূপকথার মতো। টানা দুই আসর তো দূরের কথা, বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো ফুটবলার দুই বার সর্বোচ্চ গোলদাতাও হতে পারেননি। এবারের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে যদি গোল করে এমবাপ্পে নিজেকে সবার ওপরে নিয়ে যেতে পারেন এবং গোল্ডেন বুটটি নিজের করে নেন, তবে তিনি প্রবেশ করবেন এক অনন্য রেকর্ডের ক্লাবে। ফুটবল বিশ্বের কিংবদন্তিদের পাশে তার নাম চিরদিনের জন্য অমর হয়ে থাকবে। এমবাপ্পের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায় তার অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ৪টি গোল করে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতাতে অনন্য ভূমিকা রাখেন তিনি। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফাইনালে হ্যাটট্রিকসহ মোট ৮টি গোল করে জিতে নেন মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন বুট’।
বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস ও সর্বকালের সেরা রেকর্ডের পাতায় এই দুই তারকার অবদান এখন স্বর্ণাক্ষরে লেখা। একজনের অংশ নেওয়া সকল আসর মিলিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনটি এখন লিওনেল মেসির দখলে, যিনি ৩৩টি ম্যাচে রেকর্ড ২১টি গোল করেছেন। অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পে মাত্র ২১টি ম্যাচ খেলেই ২০টি গোল নিয়ে মেসির ঠিক পেছনে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছেন। নিজেদের শেষ ম্যাচে এই রেকর্ডটিও এমবাপ্পের নিজের দখলে নেওয়ার হাতছানি। এমবাপ্পে দুটি গোল করতে পারলে, আর মেসি কোনো গোল না পেলে এবারের আসরেই মেসিকে ছাড়িয়ে যাবেন এমবাপ্পে। অবশ্য এবার না পারলেও বয়স অনুযায়ী এমবাপ্পের সামনে আরও একাধিক বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ আছে। হয়তো আগামী আসরেই সেই রেকর্ড নিজের করে নেবেন কিলিয়ান এমবাপ্পে।





































