এক-দুই কোটি নয়, প্রায় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প। আর সেই বিশাল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পদ ঘিরে খুলনা ওয়াসার ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। জটিল ও কারিগরি প্রকল্পটির পিডি হিসেবে শেষ পর্যন্ত খুলনা ওয়াসার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফিরোজ শাহকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হওয়ায় এ নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বা ‘খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২’-এর আনুমানিক ব্যয় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করছে। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন হয়।
প্রকল্প অনুমোদনের পর থেকেই পিডি পদে কে দায়িত্ব পাবেন, তা নিয়ে শুরু হয় আলোচনা ও তৎপরতা। প্রকল্পটির ফিজিবিলিটিসহ বিভিন্ন জরিপ কাজে এডিবির সঙ্গে ফোকাল পার্সন হিসেবে যুক্ত ছিলেন খুলনা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন। তবে পরবর্তীতে পিডি নিয়োগকে কেন্দ্র করে ওয়াসার একাধিক প্রকৌশলীর নাম আলোচনায় আসে।
রেজাউলকে ঘিরে বিতর্ক
পিডি পদ নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসে খুলনা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলামের নাম। অভিযোগ রয়েছে, আগের এমডি আবু সায়েদ মো. মঞ্জুর আলমের সময়ে রেজাউল ইসলাম তাকে পিডি করার জন্য মন্ত্রণালয়ে নাম পাঠানোর বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তবে ওই এমডি তাতে সম্মতি দেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। ২০২৫ সালের ২৬ জুন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও খুলনা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দেওয়া অভিযোগে গ্রাহকের প্রায় তিন হাজার মিটার চুরির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, এসব মিটারের বিপরীতে গ্রাহকদের বকেয়া বিল থাকায় মিটারগুলো চুরি যাওয়ায় ওয়াসা বড় অঙ্কের রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।
তৎকালীন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত এমডি আবু সায়েদ মো. মঞ্জুর আলম বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে ওই তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফল কী হয়েছে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এমডি পরিবর্তন ও পিডি নিয়োগে তৎপরতা
পরবর্তীতে খুলনা ওয়াসার এমডি পদে মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের নিয়োগ হয়। তবে প্রকল্পের পিডি কে হবেন—এ বিষয়ে নিশ্চয়তা না পাওয়ায় তার যোগদান নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর বিকেলে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর পরদিনই পিডি নিয়োগের জন্য তিনজনের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে। ওই দিন সন্ধ্যায় প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলামকে প্রকল্পের পিডি হিসেবে রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে সময় জাতীয় নির্বাচনের পর তাকে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় ছিল বলে সূত্রের দাবি।
তবে পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল রেজাউল ইসলামকে রুটিন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের পিডি নিয়োগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বর্তমান এমডিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
৯৪ কোটি টাকার চেক নিয়ে প্রশ্ন
রেজাউল ইসলামকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয় তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব থেকে ৯৪ কোটি টাকার চেক ইস্যুর বিষয়টি। অভিযোগ অনুযায়ী, সাউথইস্ট ব্যাংকের খুলনা শাখায় তার ব্যক্তিগত হিসাব থেকে ৩৭৫৩৩৩৫ থেকে ৩৭৫৩৩৩৮ নম্বরের চারটি চেক ইস্যু করা হয়। এসব চেকে তার স্বাক্ষর থাকলেও প্রাপকের নাম ও তারিখের ঘর ফাঁকা ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবটি বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নজরেও আসে। পরে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে খুলনা ওয়াসার এমডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টির যথাযথ তদন্ত না করে রেজাউল ইসলামকে প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত ১৩ জুলাই তাকে খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
প্রকল্পে একাধিক বিতর্কিত কর্মকর্তার নিয়োগের অভিযোগ
রেজাউল ইসলামের পাশাপাশি প্রকল্পে আরও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে—এমন ব্যক্তিদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ তালিকায় প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম সরদারসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, খুলনা ওয়াসার গ্রাহকদের মিটার চুরির একটি বড় অংশ রফিকুল ইসলাম সরদারের অধীনে থাকা স্টোর থেকে হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তদন্ত প্রতিবেদন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, সাবেক এমপির একান্ত সচিব হিসেবে পরিচিত আবু হানিফ, সাবেক মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের অনুসারী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ডালিম মোল্লা, আবু সালেহ মো. সুলতান, আব্দুর রাজ্জাক ও আব্দুল আলিমসহ কয়েকজনকে প্রকল্পে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ভিত্তিতে এসব নিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে রাখার চেষ্টা চলছে।
শেষ পর্যন্ত পিডি হলেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা
সব আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ২৯ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে খুলনা ওয়াসার বর্তমান এমডি মো. ফিরোজ শাহকে ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার ফেজ-২ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এই নিয়োগই এখন নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ প্রকল্পটি মূলত পানি সরবরাহ অবকাঠামো, প্রকৌশল ও কারিগরি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সেখানে একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ওয়াসার সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান এমডি ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলামের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রয়েছে। ফলে পিডি পদে এমডির নিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ একদিকে এবং কারিগরি বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অন্যদিকে রেজাউল ইসলামের হাতে রাখার একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
‘পিডি পদে এত মধু কেন?’
প্রায় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পকে ঘিরে একের পর এক নিয়োগ, পিডি পদে তৎপরতা, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক করার ঘটনায় খুলনা ওয়াসার ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—একটি আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পরিচালিত বড় ও কারিগরি প্রকল্পের নেতৃত্বে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কারিগরি দক্ষতাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে? একই সঙ্গে প্রকল্পের বিপুল অর্থের ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কী ধরনের নজরদারি থাকবে?
সব মিলিয়ে খুলনা ওয়াসার এই ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পে পিডি পদ ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নগরবাসীর প্রত্যাশা, প্রকল্পের প্রতিটি নিয়োগ ও আর্থিক সিদ্ধান্ত হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে। অভিযোগগুলো সঠিক কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়াও জরুরি।





































