ইরান যুদ্ধের জেরে ক্রমাগত হারে বিশ্ববাজারে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামালের সরবরাহও। এর জেরে চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্প। প্লাস্টিক শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কাঁচামালের দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। যার ফলে উৎপাদকরা উৎপাদন কমাতে, পণ্যের দাম বাড়াতে এবং সরবরাহ কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছেন। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল খাতগুলো— যেমন খাদ্য, ওষুধ ও তৈরি পোশাক শিল্প— গুরুতর বিঘ্নের মুখে পড়তে পারে। প্লাস্টিক পণ্য মূলত অপরিশোধিত তেল থেকে উৎপাদিত পেট্রোকেমিক্যাল উপাদান দিয়ে তৈরি, যার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশের প্লাস্টিক কাঁচামালের অর্ধেকেরও বেশি ওই অঞ্চলের দেশগুলো থেকে আসে।
গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলোকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন করিডর হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে। জাহাজ চলাচলে বিলম্ব, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং বিমা প্রিমিয়াম বাড়ায় মোট আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও অনেকগুণে বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে অপরিশোধিত তেল প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭২ ডলারে বিক্রি হচ্ছিল। অয়েলপ্রাইজ ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০২ ডলারে পৌঁছেছে, যা সরাসরি পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামালের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে প্লাস্টিক কাঁচামালের দাম প্রতি টন ৯০০ থেকে ৯৫০ ডলারের মধ্যে ছিল। তবে বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় দেড় হাজার ডলারে পৌঁছেছে। লজিস্টিকস ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি উৎপাদকদের আর্থিক চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্লাস্টিক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আরএফএল গ্রুপ। প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার টন কাঁচামাল লাগে প্রতিষ্ঠানটির। প্রায় ১০ ধরনের উপাদান দিয়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন করে তারা। তাদের ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ চীন থেকে আমদানি করা হয়। আরএফএল গ্রপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পল বলেন, “চলমান যুদ্ধের জেরে কাঁচামালের দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আমরা ইতোমধ্যে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পণ্যের দাম প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়িয়েছি। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দাম আরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়াতে হতে পারে। প্লাস্টিকের আসবাবপত্র, খেলনা এবং গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদন করে আকিজ প্লাস্টিকস লিমিটেড। প্রতি মাসে প্রায় তিন হাজার টন পলিপ্রোপিলিন (পিপি) আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি, যার প্রায় ৯০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আসে।
আকিজ প্লাস্টিকের চিফ অপারেটিং অফিসার মিনহাজ বিন মিজান বলেন, “কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে আমরা ইতোমধ্যে উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছি। যদি এই যুদ্ধ চলমান থাকে উৎপাদন আরও কমাতে হবে। বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ প্লাস্টিক বাজারের মূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই খাতে প্রায় ছয় হাজার ছোট ও বড় কারখানা রয়েছে এবং এতে সরাসরি প্রায় ১৫ লাখ মানুষ কর্মরত। এছাড়া খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ওষুধ, তৈরি পোশাক ও ভোক্তা পণ্যসহ প্রায় ৩০ হাজার শিল্প প্লাস্টিক পণ্যের ওপর প্যাকেজিং ও বিতরণের জন্য নির্ভরশীল। বিপিজিএমইএ’র প্রেসিডেন্ট শামিম বলেন, “বাংলাদেশের বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন প্লাস্টিক কাঁচামালের প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টনই আমদানি করা হয়। আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে অনেক ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, “খাদ্য ও ওষুধ পণ্যের নিরাপদ সংরক্ষণ এবং পরিবহনের জন্য প্লাস্টিক প্যাকেজিং অপরিহার্য। সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এই খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসিআই গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসিআই প্রেমিয়াফ্লেক্স লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানটি ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং উৎপাদনে বিশেষায়িত। প্রতি মাসে প্রায় দুই হাজার টন প্লাস্টিকের কাঁচামাল ব্যবহার করে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করা হয়। এসিআই প্রেমিয়াফ্লেক্স লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, “যুদ্ধ শুরুর পর আমাদের ২০ শতাংশ বেশি দামে কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিংয়ের উপকরণ প্রায় সম্পূর্ণই পেট্রোলিয়ামভিত্তিক। এগুলোর খরচ বেড়ে গেলে শেষ পর্যন্ত প্যাকেটজাত খাদ্য, ওষুধ এবং দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের দামও বেড়ে যাবে। প্লাস্টিক বোতল ও প্যাকেজিং উৎপাদন করে লুনা পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ। এই কোম্পানির প্রতি মাসে প্রায় ৫০০ টন কাঁচামাল লাগে। এর প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। আর বাকি অংশ ভারত, চীন, তাইওয়ান ও থাইল্যান্ড থেকে আনা হয়। লুনা পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এস এম কামাল উদ্দিন বলেন, “প্লাস্টিক কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে প্রায় ৩২ শতাংশ কর দিতে হয়। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণও পাওয়া যায় না। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং সীমিত আর্থিক সহায়তার কারণে আগামী মাসগুলোতে প্লাস্টিক শিল্প মারাত্মক চাপের মুখে পড়তে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধ শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে ভারত সাময়িকভাবে কাঁচামাল রফতানি বন্ধ করেছিল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তারা ফের রফতানি চালু করেছে। তবে আগের তুলনায় প্রতি টনে দাম বেড়েছে প্রায় ৮০০ ডলার অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কাঁচামাল সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদী বিঘ্ন বহু খাতে একটি ধারাবাহিক প্রভাব ফেলবে। যেহেতু প্লাস্টিক প্যাকেজিং খাদ্য, পানীয়, ওষুধ, প্রসাধনী এবং পোশাক শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, তাই উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। তারা আরও সতর্ক করে বলেছেন, তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বাজারে চলমান অস্থিরতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে। শিল্প নেতারা সরকারকে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা, প্লাস্টিক রিসাইক্লিংকে উৎসাহিত করা এবং সাময়িকভাবে আমদানি শুল্ক কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশের প্লাস্টিক খাত দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার মুখে পড়তে পারে বলে শঙ্কা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।





































